রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০৭:৪৮ পূর্বাহ্ন
মুক্তিযোদ্ধা একরামুল করিম:
ভোরের আলো ফোটার আগেই খবরটা এল। নিভে গেছে বাংলাদেশের রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্রটি। ভোর ছয়টায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। একটি মহা-অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম লেখা রইল সোনার অক্ষরে।
গণতন্ত্র, জন-অধিকারের আন্দোলনের রাজপথ কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র থেকে কারাগারের নির্জন কক্ষ—এই দীর্ঘ ও কঠিন পথচলায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন আপসহীন রাজনীতির প্রতীক।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী। তবে কেবল সেই পরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে যেভাবে রাজনীতির কঠিন ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব দেশকে এনে দেয় নতুন এক সম্ভাবনার দিগন্ত।
১৯৯১ সালে দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে দলকে বিজয়ী করে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ (স্বল্প মেয়াদে) ও ২০০১-০৬ মেয়াদে আবারও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রমাণ করেন গণমানুষের আস্থা অর্জনের শক্তি তাঁর রাজনীতির মূল ভিত্তি।
কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কেবল ক্ষমতার গল্প নয়—এটি নির্যাতন, বঞ্চনা ও সংগ্রামের দীর্ঘ উপাখ্যান। সময়ের পরিক্রমায় তিনি হয়ে পড়েন রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার নির্মম শিকার। এক ফ্যাসিস্ট শাসনামলে প্রথমে তাকে সেনানিবাসের বাসভবন থেকে এক কাপড়ে উচ্ছেদ করা হয়। পরে একের পর এক ভুয়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় দণ্ডিত করে পাঠানো হয় কারাগারে। দীর্ঘদিন অসুস্থ শরীর নিয়েও তাঁকে থাকতে হয়েছে পরিত্যক্ত কারাগারের বন্দিজীবনে, যেখানে ন্যূনতম মানবিক সুযোগ-সুবিধাও ছিল না।
সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায় আসে তাঁর পরিবারকে ঘিরে। দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় দেশছাড়া হতে হয়। বিদেশে নির্বাসিত জীবনযাপন করতে গিয়ে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু ছিল বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের এক অপূরণীয় ক্ষত। একজন মা হিসেবে সেই বেদনা, একজন রাজনীতিক হিসেবে সেই অসহায়ত্ব—এই দুইয়ের ভার বহন করেই তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে।
এত নির্যাতনের মধ্যেও বেগম খালেদা জিয়া আপস করেননি। তিনি মাথা নত করেননি ক্ষমতার কাছে, নেননি কোনো অনৈতিক সমঝোতা। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল স্পষ্ট—গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানুষের অধিকার প্রশ্নে কোনো ছাড় নয়। বারবার অসুস্থ হয়ে পড়লেও তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন, কখনো প্রকাশ্যে, কখনো নীরব প্রতিবাদে।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি শারীরিকভাবে ভেঙে পড়লেও তাঁর উপস্থিতি রাজনীতিতে ছিল এক নৈতিক শক্তির উৎস। বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন সংগ্রামের অনুপ্রেরণা, আর সমর্থকদের কাছে অবিচল আস্থার প্রতীক। রাজপথে সরাসরি না থাকলেও তাঁর নামেই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, তাঁর মুক্তির দাবিতে উচ্চারিত হয়েছে স্লোগান। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু তাই কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়; এটি একটি রাজনৈতিক যুগের অবসান। যে যুগে রাজনীতি ছিল আদর্শকেন্দ্রিক, যেখানে নেতৃত্ব মানে ছিল ত্যাগ ও ঝুঁকি নেওয়ার সাহস—সেই যুগ আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল।
আজ সকাল থেকে টেলিভিশনের পর্দা আর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে লাখো কোটি মানুষের চোখ নিবদ্ধ। সেখানে খালেদাময় সব কিছু। শোক-শ্রদ্ধার আবেগঘন খবর আর মানুষের অনুভূতি প্রকাশের বন্যা। সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে শোকঘন মুহূর্ত—যেখানে অশ্রুসজল চোখে মানুষ স্মরণ করছে একজন নেত্রীকে, যিনি জাতির চলমান সংকটময় সময়ে ঐক্যের প্রতীক হয়ে ছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হবে যুগের পর যুগ। তাঁর জীবন বলে যাবে—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু অবস্থান যদি দৃঢ় হয়, তবে সেই অবস্থানই হয়ে ওঠে ইতিহাস।
আপনার মন্তব্য লিখুন